তারে জমিন পার- চিত্রকল্প আর বাস্তবতা
||১|| প্রাককথন
অনেকে অনেক উদ্দ্যেশ্য নিয়ে এ ছবিটি দেখলেও আমার বিশেষ আগ্রহ নিয়ে ছবিটি দেখার মূল কারন অন্যত্র। আমার নিজের সন্তানের মানসিক বিকাশ বিলম্বিত; যার প্রয়োজনে ডাক্তার, বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল, থেরাপিস্ট, সোসাল ফোরাম সব জায়গাতেই দৌড়াই।
ছবিটির মূল চরিত্রে মানসিক প্রতিবন্ধী একটা ছেলে- সেটা দেখার কৌতুহলেই আমি ছবিটি দেখি। ছবির কাহিনী আর আমার মন্তব্য বলার আগে, আমি ছেলেটির সমস্যা, ডিসলেক্সিয়া (Dyslexia) নিয়ে একটু বলি। ডিসলেকটিক শিশুদের (৫ থেকে ১৪/১৫ বছর, বা আরো বয়স্কও হতে পারে) প্রধান সমস্যা এরা পড়তে পারে না। অক্ষরগুলো উল্টাপাল্টা, জড়ানো প্যাঁচানো দেখে। ডিসলেক্সিয়ার কারন চোখে কোন সমস্যা না, সমস্যা মস্তিষ্কের নিউরোনে। পড়তে পারে না বলে এসব বাচ্চাদের লিখতেও সমস্যা হয়। অনেক সময় মোটর স্নায়ুর সমস্যাও থাকে, যে কারনে কোন কিছু তাক (target) করা, এক পায়ে ভর করা ইত্যাদি ব্যপারগুলো এরা পারে না। ডিসলেক্সিয়ার কারন হিসেবে অনেকে জেনেটিক যোগসূত্রের কথা বলেন; আবার অনেকে পুরো ব্যপারটিকে স্রেফ পড়তে না পারার সমস্যা হিসেবে দেখেন।
আরো দুটি সমস্যা মাঝে মধ্যে আলোচিত হয় তা হলো, অটিজম (Autism) আর এসপারগার (Asperger) সিনড্রোম। এ দুটিও নিউরোনের সমস্যা- জেনেটিক সূত্র ছাড়া অন্য কোন কারণ এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নয়। অটিস্টিক/এসপারগারের শিশুদের সমস্যা কেবল পড়তে না পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ না। কথা বলতে না পারা, চিন্তাশক্তি সীমিত হওয়া, মানসিক বিকাশ বিলম্বিত হওয়া এবং মোটর স্নায়ু সংশ্লিষ্ট কাজ করতে না পারা অটিস্টিক/এসপারগার রোগীদের লক্ষণ হতে পারে। ডিসেলিক্সিয়া, অটিজম বা এসপাগারের কাউকে প্রথম দেখায় বোঝার কোন উপায় থাকে না। এসব সমস্যার কোন ধরনের কোন প্রতিকার বা নিরাময়ী চিকিৎসা নেই। কেবল আগে-ভাগে বিশেষ থেরাপি বা বিশেষ উপায়ে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিয়ে তাদের সীমাবদ্ধতা অনেকটা দূর করা যায়।
||২|| ছবির (ধরণী 'পরে আকাশের তারা) কাহিনী
ইশান্ত ৭/৮ বছরের পড়াশোনায় অমনোযোগী এক বালক। তবে তার উৎকেন্দ্রিক (eccentric) বিশেষ কিছু ব্যপারে আগ্রহ আছে। পরীক্ষায় ফেল করে, বাবা-মার কথা শোনায় আগ্রহ নেই, সমবয়সী অন্য ছেলেদের সাথে মিশতে পারে না মোটর সমস্যার কারণে। ফলাফল হিসাবে, তার বাবা-মার শাসন জোটে; স্কুলের প্রিন্সিপাল তাদের ডেকে পাঠান, ছেলের সম্ভাব্য সমস্যার কথা বলেন। ইশানের বাবা-মা সেটা পাত্তা দেয় না, বরং মনে করে ইশানের একমাত্র সমস্যা একগুঁয়েমি। এ রকম মনে করার কারণ হলো ইশান্তের অপর ভাইয়ের পড়াশোনায় সব সময় প্রথম হওয়া, খেলাধুলায় ভাল করা। তো, সমাধান হিসেবে তারা ইশান্তকে একটা আবাসিক (বোর্ডিং) স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেখানে ইশান্তের একটা বন্ধু জোটে, যার আবার একটা পা নেই। বোর্ডিং স্কুলের কড়া শাসন ইশান্তের কোন উন্নতি করতে পারে না, শিক্ষকরা উপহাস করেন, শারীরিক শাস্তিও জোটে। ঠিক এমনি সময়ে নিকুম্ভের (আমির খান) আগমন ঘটে। নিকুম্ভ পাশের একটা প্রতিবন্ধী স্কুলের টিচার, এখানে আসেন রিলিফ টিচার হিসাবে আর্ট শেখাতে। তো তিনি ইশান্তের সমস্যাটা অনুমান করতে পারেন। ইশান্তের সেই বন্ধু কিছুটা তথ্য, ইশান্তের নোটবুক ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করে। তিনি যখন অনেকটা নিশ্চিত হন ইশান্তের ডিসলেক্সিয়া সমন্ধে, তখন তিনি ইশান্তের বাবা-মার কাছে গিয়ে বিষয়টা বলেন। বাবা-মা মানতে নারাজ; কিন্তু এক পর্যায়ে তারা নিকুম্ভকে একটা সুযোগ দিতে সম্মত হন। তারপর নিকুম্ভ তার বিদ্যা দিয়ে বিশেষ উপায়ে ইশান্তকে অক্ষর সহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠ দেন। ইশান্তের অনেক উন্নতি ঘটে যায়, পড়াশোনায় ভাল করে। ইশান্তের এক সময় ভাল ছবি আঁকার হাত ছিলো; সেটা যেনে নিকুম্ভ সব ছাত্র/শিক্ষকদের নিয়ে একটা এক্সিবিশনের/ কনটেস্টের মতো আয়োজন করেন। ইশান্ত হয় প্রথম, নিকুম্ভ নিজে দ্বিতীয়। বাবা-মা এই সাফল্যে খুব খুশী হন, বড় ছুটিতে ইশান্তকে স্কুল থেকে বাড়ী নিয়ে যাওয়ার জন্য আসেন। বিদায় বেলায় ইশান্ত নিকুম্ভকে জড়িয়ে ধরে- এখানেই ছবি শেষ হয়।
||৩|| ছবির ভালোমন্দ
আমরা ছবি দেখি হয় বিনোদন (ফিচার/আর্ট ফিল্ম হলে) বা সচেতন (ডকু ফিল্ম হলে) হওয়ার জন্য। একটা ছবির উদ্দ্যেশ্যও সাধারণত এমনি হয়। তারে জমিন পারে এ দুটো বিষয়ের শঙ্করায়ণ ঘটেছে। এ ব্যপারটা বিপদজনক যদি না অডিয়েন্স ফিকশন আর বাস্তবতাটুকু আলাদা না করতে পারে। ছবিটির ভাব প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, সেজন্য হয়ত পরিচালক সে ভরসা করতে পেরেছেন। ছবিটি ফিল্ম ফেয়ার সহ বেশ কয়েটি পুরষ্কার পেয়েছে, ভারতের রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত প্রশংসা করেছেন। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে অন্য যে দুটি ছবির কথা আমার মনে আসে তা হলো, ব্ল্যাক আর খামোশী। এ ছাড়া আমার আর কোন ছবির কথা মনে পড়ে না। সে হিসেবে আমির খান খুব বড় একটা কাজ করেছেন। ভারতের অনেক স্কুল শোনা যাচ্ছে এখন এ ধরনের বাচ্চাদের বিশেষ প্রয়োজনের ব্যপারে মনোযোগী হচ্ছে। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিয়ে সতর্ক হয়েছেন। এটুকু কাজ যে আমির করতে পেরেছেন তার জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য। ছবির গান, নেপথ্য সংগীত, সিনেমাটোগ্রাফি ইত্যাদি মন কাড়া।
এবার সমালোচনায় আসি:
ক) ছবির ধরন বিবেচনায় ছবিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমির খানের পোশাক। একটা প্রতিবন্ধী স্কুলের আর্ট শিক্ষক জিন্স, টাইট টি-শার্ট আর দশ ইঞ্চি উচু জুতো পরবেন এটা আমি মানতে পারি নি। আমির খান যতগুলো দৃশ্যে উপস্থিত, তার প্রতিটিতেই একই চিত্র।
খ) এর পরের দুর্বলতা হলো কাহিনীতে। একটা মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলের অবস্থা সম্পর্কে তার শিক্ষিত বাবা-মা কিছুই জানবেন না, এটা মানতে পারি না। ছবিতে বাবাকে বিভিন্ন সময় উত্তেজিত হতে দেখা গেছে, ব্লাডি বলে গালি শোনা গেছে। কিন্তু যেটা দেখা যায়নি সেটা হলো শারীরিক শাস্তি। মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুরা তাদের পরিবারে মাত্রাতিরিক্ত নির্যাতনের শিকার হয়- এটা প্রমাণিত তথ্য। মার ভূমিকাও ছিলো গৌণ। তা বাদেও, এ ধরনের পরিবারে স্বামী আর স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে খুব টানা পোড়েন চলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পর্ক টেকেই না; এ তথ্যটাও আসেনি।
গ) নীতিগত যে সমালোচনাটা আমি এ ছবি সম্পর্কে করতে চাই তা হচ্ছে, প্রতিবন্ধী শিশুদের বাবা-মাদের প্রত্যাশাকে আকাশে উঠিয়ে দেয়া। ছবির এক চতুর্থাংশ ব্যপ্তিতে ইশান্তের অধিকাংশ দুর্বলতা দূর হয়ে গেল- এটা ছবিতে যত সহজে দেখানো হয়েছে, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক অনেক দূর। প্রতিবন্ধী শিশুদের বাবা-মারা এখন তাদের শিশুদের দ্রুত সিনেম্যাটিক আরোগ্য প্রত্যাশা করবেন। ডিসলেক্সিয়া/অটিজম/এসপারগার নিয়ে অধিকাংশ গবেষণা হচ্ছে মার্কিন দেশে। পনের কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে একজন স্পিচ-প্যাথোলজিস্ট নেই- ভারতেও সে অবস্থা রাতদিন পার্থক্য হবে সে আশা করি না। এ ধরনের বাস্তবতা ছবিতে আসেনি।
||৪|| আমাদের অজ্ঞতা
যে ধরনের মানসিক সমস্যাগ্রস্ত শিশুদের নিয়ে এ লেখাটা তাদের সবচেয়ে বড় বাধাটা সামাজিক- আমরা সাধারণ সুস্থ মানুষেরা তাদের দুর্বলতা উপলব্ধি করতে পারিনা। পশ্চিমারা এটার নাম দিয়েছে হিডেন ডিসেবিলিটি; কারন তাদের অক্ষমতাটা প্রকাশ্য নয়। আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে, দুর্বল কাউকে সম্মান করার সংস্কৃতি এখনও গড়ে উঠেনি। নিউরোনঘটিত যে কোন সমস্যার উত্তরণে দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, পুরোপুরি আরোগ্য হওয়াটাও অনিশ্চিত। তারে জমিন পার দেখার জন্য সব ধরনের দর্শকদের মধ্যে একটা শোরগোল পড়ে গেছে; ভয় হচ্ছে ছবিটি দেখে তারা প্রতিবন্ধীদের সমস্যা ও সমাধান নিয়ে খুব সরল একটা সমীকরণ রাখবে মাথায়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা এ রকম শংকার জন্ম দিচ্ছে।