নারী নীতি ও আমাদের মোল্লারা


লিখেছেন আলমগীর লেখা হয়েছে:১২ এপ্রিল ২০০৮

বেশ কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশে অস্থির অবস্থা যাচ্ছে। ঠিকই ধরেছেন সম্প্রতি মোল্লারা সরকার গৃহীত নারী নীতির প্রতিবাদে যা করছে আমি তার কথাই বলছি। তদারকি সরকার জাতিসংঘের সিডো নীতিতে সাক্ষর করেছে। সেই নীতিতে ঠিক কী আছে আরো অনেকের মতোই আমি জানি না, আমার বিশ্বাস যারা আন্দোলন করছেন তাদেরও অনেকে জানেন না। সে যাই হোক, সব কিছু যে জেনে বুঝে করতে হবে তার কী কোন কথা আছে? মোল্লাদের বক্তব্য হলো সিডো সনদে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা আছে। এ সমান অধিকার নারীর মানবিক অধিকার থেকে শুরু করে পিতৃ সম্পত্তির ভাগ পর্যন্ত আছে। মোল্লারা যার বিরোধিতা করছে সেটা বিশেষত পিতার সম্পত্তিতে নারীর পুরুষের সমান অধিকার। এ ক্ষেত্রে তারা কোরানের প্রসঙ্গ আনছে।

তাদের মনে যাই থাক আন্দোলনের দাবি হলো, কোরানে সম্পত্তি ভাগের সময় নারীকে পুরুষের চেয়ে অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারী করে আয়াত আছে, কাজেই সম্পত্তি ভাগের সময় অন্য কোন কিছু করলেই তা কোরানের বিরোধিতা করা হয়। সিডো নীতির আর কোন বিশেষ অংশে তাদের জোড়ালো আপত্তির কথা শোনা যায়নি।

সিডো সনদ স্বাক্ষর করার পর পরই মোল্লারা আন্দোলনে নেমেছে। ভাঙচুর হয়েছে, এখনও হচ্ছে, তবে সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি (যিনি কদিন আগে ইসলামি আইন ও শাসনের গুণগান করেছেন) নারীর সমঅধিকারের বিষয়টি প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে অনেককে বিপদে ফেলে দিয়েছেন। মোল্লাদের মতে, নারী নীতি গ্রহণ করে তদারকি সরকারের উপদেষ্টারা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গেছেন, তাদের তওবা না করে ফিরে আসার উপায় নেই। সে যু্ক্তিতে প্রধান বিচারপতিও একই গোত্রে পড়লেন। ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম, তারা সে ফতোয়াও দিয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া সরকারের অংশাদারী হতে কোন সমস্যা ছিলো না তাদের।

প্রথম পর্যায়ের আন্দোলনের পর সরকার মোল্লাদের আশ্বাস দেয় যে এটা কেবল একটা খসড়া নীতি, সরকার কোন আইন তৈরি করেনি। এটর্নি জেনারেল মোল্লাদের সাথে মোলাকাত করে নিশ্চিত করেন সরকার ইসলাম বিরোধী কোন আইন করবে না। এরপর তদারকি সরকারের চার উপদেষ্টা বায়তুল মোকারম মসজিদের খতিবসহ অন্যান্য নেতাদের সাথে মিলিত হয়ে নারী নীতি পর্যালোচনা করার জন্য একটা কমিটি করে দেন। কমিটিতে একজন সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া বাকী সবাই ধর্মীয় নেতা, যাদের কেউ কেউ আন্দোলনে যু্ক্ত। যারা নারী নীতির পক্ষে ছিলেন তারা নিঃসন্দেহে বড় একটা হোচট খেয়েছেন সরকারের এই কাণ্ডে। কিন্তু তদারকি সরকারের অন্যান্য কার্যকলাপ তারা দেখেছেন, তাই বিশেষ কিছু আশা করেননি। একজন নারী নেত্রী ছাড়া আর কেউ সরকারের এ কাজের সমালোচনা করেননি। সময়টা খুব খারাপ কি না।

এতক্ষণ যা বললাম তা খবরের কাগজে কম বেশী সবাই দেখেছে। এবার আমার নিজের কথা বলি। বাংলাদেশের ধর্মীয় নেতারা বা মোল্লারা দেশের স্বার্থে বা মানুষের স্বার্থে কোন আন্দোলন করেছে এমন নজির নেই। দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেলেও তারা কিছু বলেনি, তেল-গ্যাস বিদেশীদের হাতে তুলে দিলেও কিছু বলেনি, সবশেষ মানুষ ষখন খেতে পাচ্ছে না, ৩৫টাকা কেজির মোটা চাল লাইন ধরেও মিলছে না, তখনও তারা কিছু বলেনি। কারন কী হতে পারে? এসব বিষয় কোরানের আয়াতে নেই?

গত সিডরে পাঁচ হাজার মানুষ মারা গেল, শতকোটি টাকার সহায় সম্পত্তির ক্ষতি হলো। মোল্লারা না কোন সহানুভুতি প্রকাশ করেছে, না সাহায্য করার জন্য কোন উদ্যোগ নিয়েছে। কোরানে কী আছে আমি জানি না।

মু্ক্তিযুদ্ধের সময় জামাত মানুষ খুন করেছে ধর্মের নামে। জামাত বিরোধী ইসলামি একাধিক গোষ্ঠী আছে বাংলাদেশে, তারাও কখনও জামাতের এই কাজের বিরোধিতা করেনি। এখন যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা হচ্ছে তখনও তারা নিজেদের অবস্থানটা পরিষ্কার করেনি। এক্ষেত্রে কোরান কী বলে?

বাংলাদেশে ৮৫ ভাগ বা তারও বেশী মানুষ মুসলমান, ধর্ম-কর্ম করুক বা না করুক। নারী নীতি তাদের কত অংশের ঈমানে আঘাত করেছে সেটা বোঝা সম্ভব না। তবে যেখানে মানুষ পেটে ভাত দিতে পারছে না সেখানে তারা নীতি দিয়ে কী করবে!

আমার দুটি প্রশ্ন, একটা মোল্লাদের কাছে, আরেকটা সরকারের কাছে।
মোল্লাদের কাছে প্রশ্নটা হলো, দেশে ইতিমধ্যে অনেক আইন আছে যা কোরানের সাথে সংগতিপূর্ণ না, তাদের কথায় "সাংঘর্ষিক"। সেসব ক্ষেত্রে কী হবে? যেমন, কোরানের কথা হলো, ঋতুবতী হওয়ার পরই মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশের আইনে তো সেটা অন্যরকম আছে। কোরানে স্ত্রী কথা না শুনলে শাসন করা এমনকি মারধর করার অধিকার দেয়া হয়েছে স্বামীকে; বাংলাদেশে তো সেটা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে অপরাধ। পুরুষের চার বিয়ের অধিকারও তো বাংলাদেশে সীমিত করা হয়েছে। এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। এসব বাতিলের আন্দোলন কি খুব শীঘ্রই শুরু হবে?

সরকারের কাছে প্রশ্নটা হলো, কেবল নীতি করেই কী নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল? এক দিন, মাস বা বছরে পাল্টে যাবে আমাদের শত বছরের প্রচলিত ধারা? এরশাদ জন্মনিয়ন্ত্রণ চালু করার জন্য মোল্লাদের কী পরিমাণ খাতির করেছে তা অনেকের মনে আছে। সেটা বিবেকের দৃষ্টিতে ভালো না হলেও আমরা কী তার সুফল দেখিনি? মোল্লাদের না ক্ষেপিয়ে অন্য কোন ভাবে কী নারীদের অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করা যেত না?

আপডেট: ১৬/০৪/০৮
মোল্লাদের নিয়ে সরকারের গঠিত কমিটি তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। তারা কয়েকটি ধারা বাতিলসহ অনেকগুলো ধারা পরিবর্তন করতে বলেছে। সিডোতে স্বাক্ষর করা যাবে না এটাও বলেছে। আর আশ্চর্যজনক হলো, আমার কয়েকটি ধারনা ঠিক হয়েছে-
১. তারা বাল্যবিবাহ বিরোধি ধারা বাদ দিতে বলেছে, কারন ইসলাম বাল্যবিবাহ উত্সাহিত করে।
২. নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের বিলোপ চেয়েছে, কারন, এতে করে বৌ পেটানো মুশকিল হয়ে গেছে। ভাল কথা, ইসলাম (কিছু শর্তে) বৌ পেটানো সমর্থন করে।

আলমগির ভাই শুধূ শুধু মোল্লাদেরকে নিজেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড় করাচ্ছেন। আপনি নিজেই দেখতে পাচ্ছেন বাংলাদেশে এমন অনেক আঈন আছে যা ইসলামি শারিয়ার সম্পুর্ন বিপরিত। অতিতে যেভাবে আঈনগুলো পাশ হয়েছে নারিনীতিও পাশ হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নারিনীতি নিয়ে হইচৈইয়ের প্রধান কারন মোল্লাদের মৌচাকে একটু ডিল মেরে অবৈধ সরকার তার জনপ্রিয়তাকে কোনরকম ভাসিয়ে রাখা। .....................আসিফ

"ভাল কথা, ইসলাম (কিছু শর্তে) বৌ পেটানো সমর্থন করে।"

বিষয়টার অপব্যাখা হয়/হতে পারে তাই বলছি।

ইসলাম বউ পেটানো সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ (স:) এর হাদীসে একটা মেসওয়াক দিয়ে মারার কথা বলা হয়েছে। (এতে ব্যথা পাবে না, কিন্তু লজ্জা পাবে।) তাও যদি বুঝিয়ে বলার পরও না শুনে ইত্যাদি ইত্যাদি!

বিষয়টাকে এভাবে বলা যায় যদি বাচ্চারা খুব বেশি বেয়ারা হয়ে যায়, তখন তাদেরকে শাষন করা হয়। এটাও সেরকম একটা শাষন!

স্বামীদের স্ত্রীদের উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে এবং, এর মাধ্যমে মেয়েদের জন্য আসলে জীবনটাকে অনেক সহজ করে দেওয়া হয়েছে। নিজে মেয়ে হিসেবেই বলছি। আলহামদুলিল্লাহ।

পুরাটা পড়া হয়নি অবশ্য। শেষের দুইটা লাইন পড়েই কমেন্ট করে ফেলছি!! :-SS

পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে| সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ্ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে| আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না| নিশ্চয় আল্লাহ্ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।

সুরা নিসা, আয়াত ৩৪.

কোরআনের বাস্তবায়ন হয়েছে রসুলুল্লাহর জীবনে। কোরানে নির্দেশ দেয়া আছে কিন্তু কিভাবে তা করা হবে সেটা বলা নাই। কেউ যদি এখন বলে বউ পেটানোর কথা যেহেতু বলা আছে তাই বাশ দিয়ে পেটাতে হবে। কিন্তে তা ঠিক হবেনা। যেমন কোরআনে বলা আছে নামাজ কায়েক করতে হবে, কোথাও বলা নাই কত ওয়াক্ত ও কিভাবে পড়তে হবে। এটা প্রফেটের জীবন থেকেই জানতে হবে। এখানে ভুল ব্যাখ্যার কোন সুযোগ নাই। কোন কিছু না জানা মানেই অজানা নয়। জানার বাইরেও জানা থাকে।

আপনার ব্যাখ্যা আপনার নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য হোক, এ আশা করি। যদি প্রফেটের জীবন থেকেই সব (বিতর্কিত) বিষয় জানতে হয় তবে একটু বলি:
১. প্রফেটের জন্য যে কোন (বিশ্বাসী) নারী বৈধ ছিল। (সুরা আসহাব দেখুন)
২. দাসীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক তার জন্য বৈধ ছিল (একই সূত্র)। এটি এখনও বৈধ সব মুসলমান পুরুষের জন্য। (কারণ, কখনই এটা রদ করা হয়নি। )
৩. একমাত্র প্রফেটের জন্য ১৩জন স্ত্রী বৈধ ছিলো, একজনের বয়স ১১/১৩ ছিলো।